কৃষি সময়
প্রকাশ : Aug 5, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

২শ’বছরেও হয়নি কেল্লাঃ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় মহিষ

ভোলা প্রতিনিধিঃ ভোলায় ২শ’বছরেও হয়নি মহিষের জন্য স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে প্রতি বছর ঝড় জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় এখান খামারীদে কালো সোনা খ্যাত শত শত মহিষ। এতে খামারীরা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।  

জানা যায়, নদী ও সাগর বেষ্টিত দ্বীপজেলাটির মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা ছোট-বড় অন্তত ৮৫টি দুর্গম চরাঞ্চলে প্রায় ২০০ বছর ধরে মহিষ পালন করা হয়। এখানকার মহিষের দুধের কাঁচা টক দইয়ের রয়েছে জিআই পন্যের স্বীকৃতি। কিন্তু জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহিষের জন্য চরাঞ্চলে আজও গড়ে ওঠেনি সরকারিভাবে নিরাপদ ও টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে,ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার  চরাঞ্চলে ৩ হাজার ২৫০ জন খামারি রয়েছেন। ছোট-বড় ১৭৮টি বাথানে ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে বলদ মহিষ ৩২ হাজার এবং ৯২ হাজার রয়েছে গাভী মহিষ। প্রতিদিন গড়ে মহিষের দুধ উৎপাদন হয় ৮-১০ মেট্রিক টন। 
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মে মাসের ২৭,২৮ ও ২৯ তারিখে ভোলা উপকূলে তান্ডব চালায় প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় 'রেমাল'। টানা ৩ দিনের জলোচ্ছ্বাসে ভোলার চরাঞ্চলের উন্মুক্ত বাতানে থাকা ৯ হাজার ৯৩১ মহিষ ভেসে গেছে। কয়েকদিন পরে অধিকাংশ মহিষের খোঁজ মিললেও এর মধ্যে মারা গেছে ২৬৯টি। সে বছর মহিষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি টাকায়। 

এছাড়া ঘুর্ণিঝড় রেমালের জলোচ্ছ্বাসে বাথানে থাকা গরু ভেসে গেছে ৬ হাজার ৬৫৯টি, অধিকাংশ গরু খোঁজখুজির পরে পাওয়া গেলেও মারা যায় ১৭৬টি গর। ৭০ হাজার টাকা করে বাজারমূল্য হিসেবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষতির সে ক্ষত আজও শুকায়নি বাথানিদের।

এতে উদ্বেগজনক হারে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে মহিষ। বাড়ছে গবাদি পশুর প্রাণহানি। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেকে। তবে কেউেই পাচ্ছেন না সরকারি সহযোগিতাও। জলোচ্ছ্বাসে মহিষ ভেসে যাওয়া ও প্রাণহানির ঘটনাকে এ খাতের প্রতি সংশ্লিষ্টদের অবহেলাকেই দুষছেন বাথানি ও বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন।

ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভোলার চরাঞ্চলে ২২টি মাটির কেল্লা (মুজিব কিল্লা) থাকলেও নির্দিষ্টভাবে মহিষ ও গরুর জন্য নেই একটিও। তবে গবাদিপশুর জন্য বেসরকারি গ্রামীণ জন উন্নয়ন ও পরিবার উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে নির্মিত ৪টি কেল্লা হয়েছে। মহিষের নিরাপত্তায় প্রতিটি কেল্লায় ৫০০টি মহিষ ধারণক্ষমতার প্রায় ২৫০টি কেল্লা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

প্রায় ৩ যুগ ধরে ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে মহিষ পালন করেন সদর উপজেলার বৃহৎ মহিষ বাতানি আবু কাশেম। কাচিয়া, মধুপুর ও বৈরাগ্যার চরে তার ৩টি মহিষের বাতান রয়েছে। কিন্তু লাভের চেয়েও লোকসানের পাল্লাই ভারি তার। বাতান থেকে গত ৩ যুগে তার ৩০টি মহিষ জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যেগুলোর আর হদিস পাননি তিনি।

আবুল কাশেম বলেন, মহিষের বাতান দেখাশোনার জন্য রাখাল রয়েছে। ঘুর্ণিঝড় রেমালসহ বিভিন্ন সময়ের জলোচ্ছ্বাসে আমার বাথান থেকে ৩০টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, আর সেগুলো পাইনি। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি আমার মহিষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নতুন করে একটি কেল্লা নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। এতে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। 

এই খামারীর মত চরাঞ্চলের শত শত মহিষের খামারীর একই অবস্থা। ঝর,জলোচ্ছ্বাস এলেই তাদের বুক কাঁপে। এই বুঝি সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বছরের পর বছর ধরে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হযে আসছেন। কিন্তু তাদের এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। তাদের দাবী,জলোচ্ছ্বাস থেকে মহিষের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভোলার চরাঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে টেকসই কেল্লা জরুরি প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন,দু:খজনক হলেও সত্যি যে বাথানিরা জলোচ্ছ্বাস থেকে তাদের মহিষ রক্ষার জন্য নিজেরা যে নামেমাত্র কেল্লাগুলো তৈরি করেন তা ভেঙে যায়। মহিষ, গরু, ছাগল ভাসিয়ে নিয়ে যায় জলোচ্ছ্বাসে। এতে বাতানিরা প্রতিনিয়ত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের খোঁজ কেউ রাখে না। ভোলার চরাঞ্চলে টেকসই সরকারি কিল্লা প্রয়োজন। এখাত আরও সম্প্রসারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মহিষের দুধের কাঁচা দইয়েই জিআই পণ্যের সুনামও ধরে রাখা দায় হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে কথা হলে ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ সম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান জানান, মহিষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকায় ঘুর্ণিঝড় রেমালের জলোচ্ছ্বাসে ৯ হাজার ৯৩১টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সর্বশেষ গত জুলাই মাসেই ৫৪৭টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যথাযথ কিল্লা না থাকার কারণে মহিষগুলো ভেসে যাচ্ছে। ভোলার চরাঞ্চলে মহিষের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের জন্য অন্তত ২৫০টি টেকসই কিল্লা প্রয়োজন। পাশাপাশি মিঠাপানির উৎসেরও প্রয়োজন। কিল্লা নির্মাণ করা গেলে জাতীয় সম্পদ মহিষের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যাবে এবং ভোলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মহিষের খাত আরও সম্প্রসাররিত হবে। 

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তিন বিভাগে বন্যার শঙ্কা

1

পোলট্রি খামারিরা খাবার-ওষুধের দামে দিশাহারা

2

বাগেরহাটের ঢেঁড়স চাষীরা হতাশ

3

কৃষকের সবজিগাছ কেটে দিলো দুর্বৃত্তরা

4

বন্যাকবলিত পাঁচ জেলায় সহায়তা দেবে সরকার : কৃষিমন্ত্রী

5

হিলিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা

6

সরকারকে বিপদে ফেলতে পিক সিজনে নতুন সার ডিলার নীতিমালা জারি

7

রংপুরে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে নীল চাষাবাদ

8

অস্তিত্ব সংকটে বাঁশশিল্পের ঐতিহ্য

9

কংক্রিটের নগরে সবুজের কারিগর রকিবুল আমিনের গল্প

10

প্রতি হেক্টরে ধান হবে ১৫ টন, গবেষণা করছে এসিআই

11

বাণিজ্যিক বেদেনা চাষে শিবলির ভাগ্য বদল

12

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

13

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি

14

বজ্রপাত রোধে ২৩০০ তালগাছ রোপণের উদ্যোগ

15

কচুয়ায় কৃষকের জমির লাউগাছ কেটেছে দুর্বৃত্তরা

16

রেণুপোনায় ভাগ্য বদলাচ্ছে তাদের

17

রঙ্গিন মাছ চাষে ইমনের ভাগ্য বদল

18

সাতক্ষীরায় জিরার দাম কমেছে

19

খুলনাঅঞ্চল থেকে ৪৮৮৬ কোটি টাকার রপ্তানী আয়

20