কৃষি সময়
প্রকাশ : Jul 30, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

রংপুরে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে নীল চাষাবাদ

 রংপুর প্রতিনিধিঃ বৃটিশ নীলকরদের রক্তাক্ত বিদ্রোহের ইতিহাস ‘নীল চাষ’ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে রংপুরের কৃষকদের। এখানকার মাটিতে প্রায় দেড়শ বছর পর শুরু হয়েছে নীল চাষাবাদ। ইতোমধ্যে এখানকার উৎপাদিত নীল রপ্তানী হওয়ায় এই চাষাবাদে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, গঙ্গাচড়ার বড়বিল, বেতগাড়ী ও খলেয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন নীল চাষ হচ্ছে। আলু তোলার পর কিংবা আমন রোপণের আগ পর্যন্ত বছরের পর বছর যে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেই জমিতে বাতাসে দুলছে নীল গাছ। ইতিহাসের অভিশাপ নীল চাষকে সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছেন একদল কৃষক ও একজন উদ্যোক্তা। ফলে গঙ্গাচড়ার মাঠে আজ নীল শুধু একটি ফসল নয়, এটি বদলে যাওয়া সময়ের এক অনন্য গল্প। মার্চ মাসের মাঝামাঝি বীজ বপনের পর মাত্র ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই নীল গাছের পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি গাছ থেকে তিন দফায় পাতা কাটা সম্ভব। এরপর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছ রেখে বীজ সংগ্রহ করা হয়। কম খরচ, পরিচর্যা এবং তুলনামূলক বেশি লাভের কারণে কৃষকদের এ চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে।  

তথ্যমতে,১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকের অন্যতম বড় আন্দোলন। সেই আন্দোলনের প্রভাব রংপুর অঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গেও ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে একসময় বাংলা থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় নীল চাষ।

নতুন করে ২০০৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে গঙ্গাচড়া এলাকায় সেই নীল চাষ শুরু করেন স্থানীয় উদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় । গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও কৃষকদের সম্পৃক্ত করে তিনি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেড প্রাকৃতিক নীল প্রক্রিয়াজাত করে দেশি-বিদেশি বাজারে সরবরাহ করছে। যা এখানকার কৃষি অর্থণীতির নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। 

গঙ্গাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন প্রায় এক যুগ ধরে নীল চাষ করছেন। এবার তিনি ৫৯ শতক জমিতে আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে আলু কিংবা তামাক ওঠার পর জমি কয়েক মাস খালি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিতেই নীল চাষ করি। এতে বাড়তি আয় হচ্ছে, আবার জমির উর্বরতাও বাড়ছে।’

গঙ্গাচড়া ও আশপাশের এলাকার কৃষকরা নীল গাছের উৎপাদিত সবুজ পাতা স্থানীয় কারখানায় প্রতি কেজি প্রায় ৪ থেকে ৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। রংপুর সদর উপজেলার হরকলি এলাকায় অবস্থিত ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেডে এসব পাতা প্রক্রিয়াজাত করে প্রাকৃতিক ইন্ডিগো তৈরি করা হয়। প্রায় ৩শ’ কেজি সবুজ পাতা থেকে ১ কেজি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো উৎপাদন করা সম্ভব।

কৃষকদের ভাষ্য, নীল গাছের ডালপালা ও নিচের অংশ উৎকৃষ্ট জৈবসার এবং জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনেও রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে যায়।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ উপজেলার ২০টি গ্রামে এবং নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় শত শত কৃষক নীল চাষ করেছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত সমপ্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত নীল আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় এর রপ্তানি সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। একসময় যে নীল ছিল বাংলার কৃষকের কান্না, আজ সেই নীলই গঙ্গাচড়ার কৃষকের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। ইতিহাসের বেদনা পেরিয়ে নীল এখন শুধু একটি ফসল নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষির নতুন সম্ভাবনা, গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন শক্তি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে এক সম্ভাবনাময় নাম।

স্থানীয় কৃষক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতক জমিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। তিন দফায় পাতা বিক্রি করে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করা যায়। অনেক সময় লাভ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকাও হয়।’

নীল চাষাবাদের উদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া নীল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ দিচ্ছি এবং উৎপাদিত পাতা কিনে নিচ্ছি। বর্তমানে শত শত কৃষক আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন।’ তিনি জানান, বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক ইন্ডিগোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন খুবই কম। সরকারি সহযোগিতা, গবেষণা, সহজ ঋণ ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে শুধু রংপুর অঞ্চল থেকেই বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।

একসময় ‘নীল’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই বাংলার কৃষকের চোখে ভেসে উঠত ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচার, নির্যাতন আর রক্তাক্ত বিদ্রোহের ইতিহাস। কৃষককে জোর করে খাদ্যশস্যের বদলে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেই নীলই এখন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষকের কাছে বাড়তি আয়ের নির্ভরতা, পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন দিগন্ত এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস

1

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

2

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি

3

প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদি

4

সুন্দরবনের ৮২৭১ জেলে পাচ্ছেন খাদ্য সহায়তা

5

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনই বড় চ্যালেঞ্জ -কৃষিমন্ত্রী

6

সারাদেশে কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু

7

নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ জরিমানা

8

মেঘনায় ধরা পড়ল ২৫ কেজির হিলা মাছ

9

শত বছর ধরে বসছে ভাসমান সবজির হাট

10

ভিএইচটি প্লান্ট চালু: খুললো আরো নতুন দেশে আম রফতানির দ্বার

11

মহেশপুরে রাস্তার পাশে ময়লার ভাগাড়ে ভোগান্তি

12

নদী দূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই

13

পৌরবর্জ্যে নষ্ট লেমুঝিড়ির ফসলি জমি জীববৈচিত্র্য

14

বোয়ালখালীর কৃষকরা আমনের রোপণে ব্যস্ত

15

খামারবাড়িতে কর্মকর্তাদের হুমকি ও চাঁদা দাবি শেকৃবি ছাত্রদল ন

16

৬০ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্য

17

কৃষকের ৩০ শতক জমির পটল গাছ কর্তন

18

১৫৫ কেজির কোরাল মাছ দেখতে ভিড়

19

১৩ জেলায় ঘনিয়ে আসছে বন্যা

20