কৃষি সময়
প্রকাশ : Aug 26, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বগুড়ায় সংরক্ষণাগার অভাবে বছরে ৪শ’কোটি টাকার সবজি নষ্ট

বগুড়া সংবাদদাতাঃ 
সংরক্ষণাগার না থাকায় দেশের সবজি উৎপাদনের অন্যতম এলাকা বগুড়ায় বছরে এক লাখ টনের বেশি সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হওয়া এই সবজির বাজার মুল্যে প্রায় ৩৯৫ কোটি টাকা। গত বছর এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৬ টন সবজি বিক্রি না হওয়ায় পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে এখানকার কৃষকের পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।  

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বগুড়ায় আলু ছাড়া বিভিন্ন সবজি আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। এসব জমি থেকে উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৬৫২ টন সবজি। প্রতি কেজি গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা হিসাবে এসব সবজির বাজারমূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
উৎপাদিত সবজির মধ্যে জেলার অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৭৭৫ টন। উদ্বৃত্তের মধ্যে ৪৩ হাজার ২২৯ টন রপ্তানি হয়েছে। আর এক লাখ ১৪ হাজার ৩০০ টন গেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৯২ টন। এরপরও অবিক্রীত থেকে গেছে এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৬ টন সবজি।

এ অবস্থায় অবিক্রীত সবজি সংরক্ষণে জেলার পাঁচ উপজেলায় পাঁচটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি বগুড়া থেকে সবজি বিদেশে পাঠাতে বিমানবন্দরে কার্গো সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, সংরক্ষণ ও রপ্তানি সুবিধা তৈরি হলে মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে সবজির দাম পড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং কৃষকরাও উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছর সবজির উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পচে নষ্ট হওয়া সবজির পরিমাণও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বগুড়ায় সবজি উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৭ টন। ওই বছর অবিক্রীত সবজির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯২ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ৯ হাজার ৪৮৯ টন এবং নষ্ট হওয়া সবজির মূল্য ছিল প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা।

 তিন অর্থবছরের ব্যবধানে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতিও বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, মৌসুমের মাঝামাঝি বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি উঠলে দাম এতটাই কমে যায় যে অনেক সময় ক্ষেত থেকে হাটে নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচও ওঠে না। তখন জমিতেই সবজি নষ্ট করা অথবা হাটে ফেলে আসা ছাড়া উপায় থাকে না।

মহাস্থানহাটের সাবেক ইজারাদার ও সবজির আড়তদার তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছি। এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদন হলেও সে অনুযায়ী ক্রেতা নেই। উৎপাদন ও হাটে আমদানি বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। তখন অনেকে সবজি ফেলে দিয়ে যান। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট সবজি শ্রমিক দিয়ে হাট থেকে পরিষ্কার করতে হয়।’
বগুড়া থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সবজি যায়। জেলার সবচেয়ে বড় সবজির মোকাম মহাস্থানহাট। শীত মৌসুমে এই হাট থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০০ ট্রাক সবজি বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। তবে ভরা মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম পড়ে যায়। তখন প্রতিদিনই কয়েক ট্রাক সবজি বিক্রি না হয়ে নষ্ট হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

বগুড়া সদর উপজেলার রবিবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘রবি মৌসুমের বড় একটা সময় রোজার মধ্যে ছিল। ওই সময় সবজির দাম অনেক কম ছিল। জমিতে বেগুনের ফলন ভালো হলেও ভালো দাম পাইনি। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে অন্য সময়ে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যেত। সংরক্ষণের কোনো উপায় নেই জেনে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আবার কোনো কোনো দিন বিক্রি না করেই ফিরে আসতে হয়। তখন ফসল রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া বা গরুর খাবার করা ছাড়া উপায় থাকে না। সবজি সংরক্ষণ করা গেলে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পেতেন, তেমনি মানুষও সাধ্যের মধ্যে সবজি কিনতে পারত।’
সবজি দ্রুত পচনশীল পণ্য। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কোল্ড চেইন, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল মিলবে না। বগুড়ায় যে পরিমাণ সবজি নষ্ট হচ্ছে, তা শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় সম্পদেরও অপচয় বলছেন কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ সংকট নিরসনে সবজি সংরক্ষণের জন্য বগুড়ার পাঁচ উপজেলায় পাঁচটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত স্থানগুলো হলো শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর, গাবতলী, বগুড়া সদর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলা। সম্প্রতি এসব স্থানে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি দল।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তা শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন হবে। সংরক্ষণাগারগুলো চালু হলে এ অঞ্চলের সবজি নষ্ট ও অপচয় কমবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। বগুড়ার সবজি দেশের বাজারে বিপণন বিদেশে পাঠানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া বিমানবন্দর থেকে কার্গো সার্ভিস চালু করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। এটা চালু হলে এ অঞ্চলের শাকসবজি সহজেই বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে|

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বন্যপ্রাণীদের বন্ধু সীতেশ আর নেই

1

লংগান চাষে সাফল্য পেয়েছেন প্রিয়দর্শী চাকমা

2

ভাঙ্গায় দূষণ দখলে সংকটে কুমার নদ

3

জুলাইয়ে এলো ৩৫ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স

4

মাধবদীতে ২ কোটি টাকার কারেন্ট জাল জব্দ

5

১৫ টাকা কেজিতে চাল পাবে স্বল্প আয়ের ৫৫ লাখ পরিবার

6

কাজিপুরে ডিমের হালি ৫০ টাকা!

7

১০ বছরে জমি কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর

8

ব্রি’র অর্গানিক সার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাবে ইউরিয়ার ব্যবহার

9

পেঁপে গাছ পঁচে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি

10

সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

11

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

12

চরাঞ্চলের জলবায়ু-সহিষ্ণু উন্নয়নে জাতীয় অগ্রাধিকার জরুরি

13

বাকৃবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি রফিকুল সম্পাদক আসাদুজ্

14

পানির দামে গোলাপ বিক্রি

15

বাগেরহাটের ঢেঁড়স চাষীরা হতাশ

16

লেবু চাষে আমজাদের বাজিমাত

17

৭৩ হাজার গাছ লাগাবে বিজিবি

18

কাঁঠাল বীজ থেকে খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান প্রযুক্তি উদ্ভাবন

19

দুই লজ্জাবতী বানর উদ্ধার

20