ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ ঝালকাঠিতে ‘বাংলার আপেল’ খ্যাত পেয়ারায় অ্যানথ্রাঙ্ রোগে কালো ছিট ও দাগ দেখা দেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। তীব্র খরায় একদিকে পেয়ারার ফলন কম,অন্য্যদিকে অ্যানথ্রাঙ্ রোগ। সব মিলিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
জমে উঠেছে ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী দুই শ’ বছরেরও বেশি পুরোনো ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারার হাট। হাটজুড়ে এখন ক্রেতা-বিক্রেতা ও পাইকারদের হাঁকডাক আর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
চাষিদের তথ্যমতে, প্রায় দুই শ বছর আগে বিচ্ছিন্নভাবে আবাদ শুরু হলেও ১৯৪০ সাল থেকে এখানে বাণিজ্যিক পেয়ারা চাষ শুরু হয়। ২০২৩ সালেও অন্তত ১৯৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক আবাদ হয়েছিল এবং ফলন হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার টন। কিন্তু এ বছর ফলন এতই কম যে, শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
জানা যায়,বরিশালের বানারিপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি ঘিরেই পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে বরিশালের বানারীপাড়া ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠির ১৩ গ্রামে ৫৬২ হেক্টর এবং স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। আষাঢ-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এই অঞ্চলের নদী-খালজুড়ে পেয়ারার সমারোহ। এখানকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন এই পেয়ারা চাষাবাদে জড়িত।
ঝালকাঠির কীর্তিপাশা, ভীমরুলী, শতদশকাঠি, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়কাঠি, জগদীশপুর, মীরাকাঠি, শাখাগাছির, হিমানন্দকাঠি, আদাকাঠি, রামপুর ও শিমুলেশ্বর গ্রামের বিশাল অংশজুড়ে যুগ যুগ ধরে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারার চাষ হয়ে আসছে। তবে এ বছর গাছে দেরিতে ফুল আসায় এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে বেশিরভাগ ফুল ঝরে পড়ে। বর্তমানে শ্রাবণের মাঝামাঝিতে পেয়ারার ভরযৌবন চললেও অ্যানথ্রাঙ্ রোগে আক্রান্ত হয়ে পেয়ারার গায়ে কালো ছিট ও দাগ পড়ে গেছে। ফলে মৌসুম শেষে হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পঙ্কজ বড়াল বলেন, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পেয়ারা গাছের বেশিরভাগ ফুল ঝরে পড়েছে। যা ফলন টিকেছে, তাতেও কালো ছিট পড়া দাগ বসে গেছে। বাগানের পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের খরচই শেষ পর্যন্ত উঠবে কি না, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।
বিপুল চক্রবর্তী নামে আরেক পেয়ারা চাষী বলেন, আমাদের পরিবারের তিনজনই পেয়ারা বাগান পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত থাকি। বছরের এই মৌসুমের আয় দিয়েই সারাবছর সংসার চলে। এ বছর ন্যায্য দাম না পেলে এই তিন মাস এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে সংসার চালাব, তা সৃষ্টিকর্তাই জানেন
আরেক কৃষক দেবব্রত হালদার বিটু জানান, পেয়ারা আমাদের মৌসুমি আয়ের একমাত্র উৎস। ফলন ভালো হলে আমাদের সংসারে সচ্ছলতা আসে। ভাসমান এই হাটে প্রতিবছর কোটি টাকার লেনদেন হয়। পর্যটক ও পাইকারদের উপস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও লাভবান হন। কিন্তু পেয়ারার ফলন কম হওয়া এবং অ্যানথ্রাঙ্ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় সার্বিক লেনদেন ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, পেয়ারার অ্যানথ্রাঙ্ একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ। এটি প্রতিরোধে আক্রান্ত ডালপালা ও ফল ছাঁটাই করে ধ্বংস করতে হবে এবং ফুল আসার আগে ও পরে নিয়মিত অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হলেও ৫ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
কৃ/স/জয়