সাতক্ষীরা সংবাদদাতাঃ
সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় অসময়ের নতুন জাতের তরমুজ চাষাবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন কৃষক-কৃষাণীরা। একটি সংস্থার সহযোগীতায় তারা একসাথে ২১ বিঘা জমিতে এই তরমুজ চাষে মোটা অংকের টাকা আয় করছেন। তাদের সাফল্য দেখে অন্যরাও এই চাষাবাদে উৎসাতি হচ্ছেন।
তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তিন গ্রামের কৃষকরা এবার একই সঙ্গে অমৌসুমি তরমুজ চাষে নেমেছেন। সুকদেবপুর, তেঁতুলিয়া ও ভায়ড়া গ্রামের ২৮ জন কৃষককে নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি কৃষক ক্লাস্টার। তারা প্রায় ২১ বিঘা জমিতে ‘ইয়েলো ড্রাগন’ ও ‘কার্নিয়া’ জাতের তরমুজ চাষ করছেন। একটি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় গড়ে ওঠা এই ক্লাস্টারে কৃষকরা শুধু একই ফসল চাষ করছেন না, নতুন পদ্ধতি শেখা, চাষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং মাঠের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগিও করছেন।
কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষে খরচ হয় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। পরিচর্যা ঠিক থাকলে এক বিঘা জমি থেকে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত তরমুজ বিক্রি করা সম্ভব। তিন গ্রামের প্রায় ২১ বিঘা জমি থেকে এবার প্রায় ৪২ হাজার কেজি তরমুজ উৎপাদনের আশা করছেন তারা, পাইকারি বাজারে যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা।
জমিতে উঁচু বেড তৈরি করা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে। এরপর বেডের ওপর বিছানো হয়েছে মালচিং পেপার। এতে মাটির আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আগাছা কমাতে সহায়তা করছে। তরমুজের লতা মাটিতে না রেখে বাঁশের মাচায় তোলা হয়েছে, যাতে ফল ভেজা মাটির সংস্পর্শে না থাকে। কচি ফল জালের ব্যাগে ঢেকে রাখায় পোকামাকড়ের আক্রমণ ও বৃষ্টির সরাসরি ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
এখানকার তরমুজ চাষী শিরিনা খাতুনের ৪৩ শতক জমিতেও চাষ হয়েছে ‘ইয়েলো ড্রাগন’ ও ‘কার্নিয়া’ জাতের তরমুজ। আধুনিক পদ্ধতিতে এই চাষাবাদে বীজ, সার, মালচিং পেপার, বাঁশের মাচা তৈরি, ফল ব্যাগিংসহ এ পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। খেতে ফলের আকার ও সংখ্যা দেখে এখন বিক্রির অপেক্ষায় তিনি।
এই চাষী বলেন‘মৌসুমে সবাই তরমুজ ফলায়। তখন বাজারে একসঙ্গে অনেক তরমুজ ওঠে, দামও কম থাকে। এখন তরমুজ কম, তাই ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ আছে। সেই হিসাব থেকেই এবার চাষ করেছি। তবে বর্ষার মধ্যে তরমুজ হবে কি না, সেটা নিয়ে শুরুতে চিন্তা ছিল। এখন ফলন দেখে মনে হচ্ছে চেষ্টা করে ভুল করিনি।
ভায়ড়া গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘একজন একা নতুন পদ্ধতিতে চাষ করলে কোনো সমস্যা হলে সমাধান করতে সময় লাগে। আমরা একসঙ্গে করছি বলে কার খেতে কী হচ্ছে, সেটা অন্যরাও দেখতে পারছি। কারও খেতে ভালো ফলন হলে সে কীভাবে করেছে, সেটাও শিখতে পারছি।
তেঁতুলিয়া গ্রামের কৃষক শিপন বিশ্বাস বলেন, ‘বর্ষায় তরমুজ করা নিয়ে আগে ভয় ছিল। এখন উঁচু বেড, মাচা আর মালচিং পেপার ব্যবহার করছি। সবাই কাছাকাছি থাকায় কোনো সমস্যা হলে আলোচনা করা যায়। একজনের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগছে।
দলগতভাবে চাষের এই সুবিধা শুধু মাঠের পরিচর্যায় সীমাবদ্ধ নেই, ফসল বিক্রির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। তিন গ্রামের ২৮ কৃষকের জমিতে একই সময়ে তরমুজ হওয়ায় একসঙ্গে বড় পরিমাণ তরমুজ সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন পাইকাররা। ফলে কৃষকদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে তরমুজ নিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে না। অনেক পাইকার সরাসরি খেত থেকে তরমুজ কিনে নিচ্ছেন।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আকারভেদে প্রতিটি তরমুজ কেজিপ্রতি বর্তমানে পাইকারিতে ৫০-৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজেরা খাতুন বলেন, বর্ষার সময়ে তরমুজ চাষে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও মাটির আর্দ্রতা বড় ঝুঁকি। উঁচু বেড করলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়। মালচিং পেপার মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং আগাছা কমাতে সহায়তা করে। আবার মাচায় গাছ তুলে দেওয়ায় ফল মাটির সংস্পর্শে থাকে না। ফলে বর্ষার সময়ে তরমুজ চাষের ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়।
কৃ/স/জয়