কৃষি সময় ডেস্কঃ মেহেরপুরে লোকালয়ে নেমে আসা হনুমানের দল আর ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় খাদ্যসংকটে থাকা শত শত বানরের চিত্র যেন একই সংকটের দুটি ভিন্ন রূপÑ একদিকে মানুষ-প্রাণীর সংঘাত, অন্যদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত বনজ পরিবেশের নির্মম বাস্তবতা। ক্ষুধা প্রাণীকে বাধ্য করে স্বাভাবিক আচরণের বাইরে যেতে। বনভূমিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের সংকট দেখা দিলে সেই প্রভাব পড়ে বন্যপ্রাণীর জীবনচক্রে আর তার অভিঘাত এসে লাগে মানুষের জনপদেও।
মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার গৌরীনগর, আনন্দবাস, বাগোয়ান, নাজিরাকোনা, দারিয়াপুরসহ কয়েকটি গ্রামে প্রতিদিন ২০-৩০টি হনুমানের দল দেখা যাচ্ছে। ক্ষুধার তাড়নায় তারা ঢ়ুকে পড়ছে ফসলের মাঠ, ফলের বাগান ও বসতবাড়িতে। কলা, পেঁপে, ধান, আম ও লিচুগাছের কচি পাতা খেয়ে নষ্ট করে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও হাতেগোনা কয়েকটি হনুমানের দেখা মিলত। এখন তারা চলাচল করছে দলবদ্ধভাবে। খাবারের অভাবে লোকালয়ে চলে এসে তারা মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ বন বিভাগ এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থাপনা শুরু করতে পারেনি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুর বনবিটে পর্যাপ্ত খাবারের অভাব। প্রায় ৫০ একর শালবন ঘিরে ৭ শতাধিক বানরের বসবাস। সম্প্রতি দেড় শতাধিক মা বানর বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, আরও কয়েক ডজনের বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সীমিত খাদ্যের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সন্তোষপুর গ্রামটিতে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের ১০৩৬ একর জমিতে রয়েছে রাবার প্রকল্প। বনজঙ্গল ও রাবার বাগান দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও আসেন। বনের ভেতর আনারস ও কলার বাগান থাকলেও মালিকরা পাহারা দেওয়ায় বানর সেখানে যেতে পারে না। ফলে দর্শনার্থীদের দেওয়া খাবার ও বন বিভাগের সীমিত খাদ্যই তাদের প্রধান ভরসা। বর্ষাকালে পর্যটক কমে যাওয়ায় সেই উৎসও কমে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এক মাস ধরে বেড়েছে এ উপদ্রব। শিশুদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক আর কৃষকরা প্রতিদিন গুনছেন লোকসানের হিসাব।
তবে খাদ্যসংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিনের বন ধ্বংসের ফল। একসময় শাল, সেগুনসহ নানা বৃক্ষে সমৃদ্ধ এই বন ছিল বহু বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস। সন্তোষপুর বিটে ৩ হাজার ৬৩৯ একর বনাঞ্চল ছিল। তার মধ্যে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে ৩ হাজার ৮১ দশমিক ৫৪ একরে। ২০১৯ সালে শেষদিকে ৩২৫ হেক্টর জমিতে টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) বাগান করে বন বিভাগ। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ১৭৩ দশমিক ২ একর জমি দখল করে বাড়িঘর তৈরি করে বসবাস করছেন। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫০ একর ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৫ একর জমি উদ্ধার করে বন বিভাগ। মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা, বনভূমি দখল এবং কৃষিজমিতে রূপান্তরের কারণে বনে খাদ্যসংকট শুরু হয়েছে।
সন্তোষপুর বিট কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হকের ভাষ্য, ‘বানরের খাবারের জন্য সরকারি কোনো স্থায়ী বরাদ্দ নেই। উপজেলা প্রশাসন বছরে দুই দফায় চার টন চাল দেয়। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কেজি চাল ছিটিয়ে দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দখলমুক্ত করা জমিতে ধাপে ধাপে নতুন বনায়নের কাজ চলছে।
কৃ/স/জয়