কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 8, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সোনালি ফসল কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা

খাগড়াছড়ি সংবাদদাতাঃ 
খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকার পাহাড়ে পাহাড়ে চলছে জুম ধান কাটার উৎসব। এবার ভাল ফসল হওয়ায় চাষীদের মুখে হাসি ফুটেছে। একদিকে চলছে ধান কাটা অন্যদিকে চলছে মাড়াই। সবমিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে জুম চাষীরা।

জানা যায়,চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর পাহাড়ে জুম চাষ হয়েছিল। চলতি বছরে চাষের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুম চাষের জমি কমেছে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর বা প্রায় ৫৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান পাহাড়ের প্রচলিত কৃষিব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুম চাষ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগে যে পাহাড়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর জুম চাষ করা হতো, তার অনেক জায়গায় এখন ঘরবাড়ি, ফলজ বাগান কিংবা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠছে।
পাহাড়ের ঢালে ফলজ বাগান স্থাপন অনেকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের একটি উপায়। বিশেষ করে যাদের জমি ও বিনিয়োগের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা ফলজ বাগানের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে জুম চাষের জন্য জমি ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর পক্ষে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হচ্ছে।

জুম চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমির স্বল্পতা, পাহাড়ে বসবাসের ঘরবাড়ি সম্প্রসারণ, ফলজ বাগান গড়ে তোলা এবং কৃষিকাজের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক পরিবার আগের মতো জুম চাষ করতে পারছে না। যারা এখনো এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন, তাদেরও উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সীমানা পাড়া এলাকার জুমচাষি মিলন ত্রিপুরা বলেন, তিনি এ বছর তিন হাঁড়ি জুম ধান চাষ করেছেন। তবে আগের তুলনায় এখন ফলন কমে গেছে। ফসল উৎপাদনে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় লাভ বাড়েনি।

তিনি আরও বলেন, আমার নিজস্ব জমি নেই। জুম চাষ করে ৩০-৩৫ মণ ধান পাই। কিন্তু এখন সার দিতে হয়, কীটনাশক দিতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় লাভ হয় না। ছেলে-মেয়েরাও জুম চাষে আসতে চায় না।

আলুটিলা এলাকার চন্দ্র কিরণ চাকমা জানান, এখনো পাহাড়ের অনেক পরিবার জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। জুমে শুধু ধান নয়, ভুট্টা, তিল, কাউন, মারফা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করা হয়। তার মতে, জুমচাষিদের সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এই কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলো উপকৃত হতে পারে।

জুম চাষে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়। ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন শস্য ও সবজি চাষের মাধ্যমে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসে। কিন্তু চাষের জমি কমে গেলে এই বহুমুখী উৎপাদনের সুযোগও সংকুচিত হয়। ফলে বিষয়টি শুধু ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পাহাড়ি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্নও জড়িত।

জুম চাষ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ শ্রমিকের অভাব। পাহাড়ের ঢালে জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার, ফসলের পরিচর্যা, ধান কাটা ও মাড়াই প্রতিটি ধাপেই শ্রমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃষিকাজের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়ায় অনেকেই জুম চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।

বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ আর পূর্বপুরুষের এই পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। অনিশ্চিত আয়, পরিশ্রমের তুলনায় কম লাভ এবং জমির সংকট তাদের অন্য পেশার দিকে যেতে উৎসাহিত করছে। 

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে ফলজ বাগান বেড়ে যাওয়ায় জুম চাষের জমি কমছে। জুমে ধান উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পক্ষ থেকে এ বছর চাষিদের পাঁচ কেজি করে ধানের বীজ এবং ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) পক্ষ থেকেও বীজ দেওয়া হয়েছে। ব্রি ধান-৮৩, বিনা ধান-১৯ ও বিনা ধান-২১ জাতের ধানবীজ জুমে চাষ হয়েছে। তার মতে, এ বছর তিনটি জাতেরই ভালো ফলন হয়েছে। ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতও ফলন ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাঁচড়া পোনা মোকামে দৈনিক লেনদেন দুই কোটি

1

চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস

2

বিলুপ্তির পথে সাদা বক

3

সমতলের আদিবাসীদের কারাম বৃক্ষ জিঁইয়ে রাখতে হবে -উজ্জল কুমার

4

কিংস প্যালেসের পিজন স্কোয়ার-মানুষের সঙ্গে কবুতরের বন্ধুত্বপূ

5

ক্যাপসিকাম চাষে কৃষকের মুখে হাসি

6

হর্টিকালচার সেন্টারে চারা-কলমের নতুন মূল্য নির্ধারণ

7

৩ শ’বস্তা সার সহ আটক ১

8

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি

9

খাল খননে ফিরল কৃষির সুদিন

10

বন্যপ্রাণীদের বন্ধু সীতেশ আর নেই

11

বাঁশের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাতে চান হাজীমুল

12

জমে উঠেছে পলো উৎসব

13

নরসিংদীতে ৬৮ লাখ টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট রিং জাল জব্দ

14

বাঘের হামলায় স্বামীহারা ৩১ পরিবার পেল ছাগল

15

শেকৃবিতে খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় দোয়া মাহফিল

16

বেগুন ও লাউ চাষে লিটনের বাজিমাত

17

ফরিদপুরে লোকসানের মুখে মরিচ চাষিরা

18

ধান ক্ষেতের আইলে মিষ্টি কুমড়ার চাষ

19

কুড়িগ্রামে বাড়ছে জৈব সারের ব্যবহার

20