কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 9, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

চলনবিলে পাখি শিকারের মহোৎসব

নাটোর সংবাদদাতাঃ 
চলনবিলে চলছে নির্বিচারে পাখি শিকার। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তি ফাঁদ, বিষটোপ, এয়ারগান ব্যবহার কওে পাখি শিকার করছে। শিকার করা এসব পাখি আবার স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে পাখি শিকার করায় দিন দিন কমছে পাখির সংখ্যা, যা হুমকির মুখে ফেলছে পুরো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য।

জানা যায়, চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং লালপুর উপজেলার পদ্মাচরে শীতের শুরু থেকেই ফাঁদ, জাল ও বিষটোপসহ নানা কৌশলে নির্বিচারে পাখি শিকার করা হয়। সংগৃহীত এসব পাখি অনেক সময় স্থানীয় হাট-বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও চায়ের দোকানে গোপনে বিক্রি করা হয়। আর এই বেচাকেনাই শিকারিদের আরও বেশি উৎসাহিত করছে।

চলনবিলের হালতিবিল এলাকায় দেখা যায়, বিলের ধানক্ষেত ও জলাশয়ের চারপাশে অভিনব কায়দায় লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ বা ‘কিল্লা ঘর’ তৈরি করা হয়েছে। এসব ফাঁদে একটি জীবন্ত পাখিকে আটকে রেখে সেটির ডাক ব্যবহার করে অন্য পাখিদের আকৃষ্ট করা হয়। এই ফাঁদে একটি পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়; সেই পাখিটি ছটফট করলে ও ডাকলে আশপাশের অন্য পাখিরা কাছে ছুটে আসে এবং মুহূর্তেই জালে আটকা পড়ে। জালে ধরা পড়ার পর পাখিগুলোকে খাঁচায় বন্দি করে স্থানীয় হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হয়। এমনকি শিকারিরা অনেক সময় ধরা পড়া পাখির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম অমানবিক কাজও করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। 
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, এসব অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করেই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র। স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে শিকারিদের কারাদণ্ড, জরিমানা এবং জীবিত পাখি উদ্ধার করলেও এই অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

চলতি সপ্তাহে সিংড়া উপজেলার পাটশাঐল মৌজার ধানক্ষেতে নয়ন হোসেন ও সাগর নামের কয়েকজন শিকারিকে বড় পাতার ফাঁদ ও টোপ হিসেবে ব্যবহৃত পাখি নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায়। প্রতি জোড়া পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। মোতালেব সেখ নামের আরেক শিকারি জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে শখের বশে পাখি শিকার করছেন তিনি এবং প্রতিদিন এভাবে ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে তার প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় হয়।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ রক্ষায় তারা দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন উদ্ধার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি দেওয়া তথ্যমতে, এ পর্যন্ত তাদের অভিযানে প্রায় ৫,০০০টি বক পাখি, ৭৩৯টি ঘুঘু পাখি, ১০৫টি শামুকখোল, ২২০টি টিয়া পাখি, ৫টি ময়না পাখি, ২৫টি কচ্ছপ, ২৯টি পেঁচা, ১টি মদনটাক, ১ টি হিমালয় গৃধিনী শকুন, ১৭১টি শালিক পাখি, ৭টি বাগডাশ, ৫টি বিরল প্রজাতির গুঁইসাপ, ৮৫টি পাতি সরালি (বালিহাঁস), ৫৫টি ডাহুক পাখি, ৩৫০টি চাকলা পাখি, জবাইকৃত ২৫০টি চাকলা পাখি, ৫টি পানকৌড়ি, ৩০টি মাছরাঙা, ১৫টি হটটিটি, ১০টি মেছো বাঘ ছানা উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া চায়না জাল থেকে ৫টি পদ্মগোখরা সাপসহ বিভিন্ন দেশীয় ও অতিথি পাখি উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্ন মেয়াদে ২৫ জনকে সাজা প্রদান, ৪২ জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায় এবং ৭২ জনের মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০টি এয়ারগান জব্দ (ধ্বংস ও হস্তান্তর), ১৬০টি কিল্লা ঘর ফাঁদ ধ্বংস, প্রায় ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ফাঁদ ধ্বংস, ১১০টি বাটুল এবং বিভিন্ন প্রজাতির ফাঁদ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে, আবার কিছু পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।

তিনি আরও জানান, ২০১২ সালে গঠিত এই সংগঠনটি ২০১৪ সাল থেকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ (রাজশাহী বিভাগ) থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়ে কাজ করে আসছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের নির্দেশনায় সংগঠনের সদস্যরা প্রতিনিয়ত পাখি উদ্ধার ও বিরল প্রাণীদের সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।

সিংড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। শনিবার চলনবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন শিকারির প্রত্যেককে একদিনের কারাদণ্ড এবং দুই হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় অর্ধশতাধিক বক পাখি আকাশে অবমুক্ত এবং ১০টি কিল্লাঘরের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়েছে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বর্ষায় প্রাণিসম্পদের যেসব যত্ন ও সতর্কতা জরুরী

1

মাশরুম চাষে রাজিবের সাফল্য

2

তীব্র খাদ্য ঝুঁকিতে পড়বে দেশের এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ

3

কাজীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ চত্বরে বৃক্ষরোপণ

4

মহাসড়ক অবরোধ করে পোলট্রি খামারিদের বিক্ষোভ

5

মান সনদ ছাড়াই ফিড ব্যবসাঃ ৭ প্রতিষ্ঠানকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা

6

খোয়াই নদীর বাঁধে ভাঙনে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা

7

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি

8

১০ হাজার চারাগাছ উপড়ে ফেলল দুর্বৃত্তরা

9

রাজশাহীতে আলু নিয়ে বিপাকে হিমাগার মালিকরা

10

ইতালির সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বা

11

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে চড়া মাছের বাজার

12

মাছ না পেয়ে পেশা বদলাচ্ছে জেলেরা

13

সাতক্ষীরায় কমেছে ডাল জাতীয় ফসল উৎপাদন

14

পুকুরে বিষ দিয়ে ৫ লাখ টাকার মাছ নিধন

15

কোল্ড স্টোরেজে বিদ্যুতের বিল বাড়ায় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে কৃষকের

16

খাল খনন না হওয়ায় ফেরত গেল ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা

17

হারিয়ে যাচ্ছে গাব

18

পিরোজপুরে ব্যতিক্রমী ভাসমান পেয়ারার বাজার

19

কৃষকের ৬০ শতক জমির কাঁকরোলগাছ কেটে দিল দুর্বৃত্ত

20