কঙ্বাজার সংবাদদাতাঃ
কঙ্বাজারের পেকুয়ায় পান চাষীরা নানা সমস্যায় লাভবান হতে পারছেন না। দেশজুড়ে এখনকার মিষ্টি পানের চাহিদা ও বাজার দর থাকলেও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে চাষীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। এতে সম্ভাবনাময়ী এই চাষাবাদ অনেকটাই থমকে আছে।
পেকুয়া উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা শিলখালী, বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের বিস্তৃত পাহাড়ি ঢালু এলাকায় মাঠের পর মাঠজুড়ে পান চাষাবাদ হয। এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত মিষ্টি পান ও গাছ পানের চাহিদা শেজুড়ে। এসব এলাকার শতকরা ৮০ ভা মানুষ পান চাষের সাথে জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ের টানা বৃষ্টি বন্যায় পাহাড় ধ্বসে চাষীদের পান বরজ মাটি চাপা পড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বরজ পুনর্র্নিমাণে তাদের আর্থিক সংগতি না থাকায় এনজিওর চড়া সুদের ঋণের জালে আটকে পড়ছেন বেশিরভাগ চাষী। নতুন করে চাষাবাদের পুঁজি সংকটে পড়ে অনেক চাষী এখন বেকার বসে আছেন। ক্ষতিগ্রস্থেও দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তারা এ চাষাবাদে কোন ধরনের প্রণোদনা কিংবা ক্ষতিপূরণ পাননি। এমন অবস্থা চরম অনিশ্চয়তা দিন কাটাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় চাষিরা বলছেন এই চাষাবাদে রয়েছে তাদের আরো অনেক সমস্যা। এখানকার পানের বরজ পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে ও উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও শ্রম দিতে হয়। পানের বরজে মূলত জালে পচা রোগ, পানের পুঞ্জা,হালিনাগীর আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
মাসে প্রায় ৫ বার ২ হাজার টাকার বিষ প্রয়োগ করতে হয়। মাসে দুবার ১ হাজার টাকা করে ভিটামিন এবং টিএসপি, সাদা সার ও গোবর বাবদ মাসে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। সপ্তাহে পান তুলতে এবং তা সুন্দর করে সাজাতে ৮ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। যাদের মাসিক মজুরি দৈনন্দিন হিসাব বাবদ যায় প্রায় ৮ হাজার টাকা। মাসে চারবার পান তোলা যায়। প্রতিবারে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হিসাবে মাসে সর্বমোট প্রায় ২৪ হাজার টাকার পান বিক্রি হয়।
উচ্চ উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও এনজিওর কিস্তি মেটানোর পর চাষিদের হাতে আর কোনো উদ্বৃত্ত থাকে না।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে সপ্তাহে লাখ লাখ টাকার পান বেচাকেনা চলে। স্থানীয় জারুলবুনিয়ায় মঙ্গলবার, কাছারি মুড়া স্টেশন পানবাজারে প্রতি শুক্রবার সকালে বসে হাট। যেখানে লাখ লাখ টাকার পান বেচা-কেনা হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও রাজধানী ঢাকার বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে এসব হাট থেকে উন্নত মানের মিষ্টি পান ও গাছ পান কিনে সারা দেশে সরবরাহ করেন। তবে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও নিবেদিত পান সংরক্ষণাগার না থাকায় পরিবহনকালেও প্রচুর পান পচে নষ্ট হয়ে যায়।
স্থানীয় পানচাষি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন সংরক্ষণের অভাব ও রপ্তানি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রাজশাহীর পান সহজে পচে না বলে তা সৌদি আরবসহ বিদেশে রপ্তানি হয়। কিন্তু আমাদের পেকুয়ার সুস্বাদু মিষ্টি পান ফ্রিজে রাখলেও পচে যায়। পচন রোধে পান কীভাবে আধুনিক প্যাকেজিং ও হিমায়িত উপায়ে সংরক্ষণ করতে হয়, তা হলে আমরা এত ক্ষতির মুখে পড়তাম না।
জারুলবুনিয়ার ৫০ বছর বয়সী ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষি মোহাম্মদ বেলাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি ১০ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে পান চাষ করে আসছি। কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনে কোনো দিন সরকার থেকে আমাদের পানের বরজে এসে অনুদান দিতে দেখিনি। আমরা কোনো সরকারি কৃষিঋণও পাই না। কম সুদে ব্যাংক লোন পেলে আমাদের এনজিওর চড়া সুদের কিস্তি নিতে হতো না।
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকতা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, কৃষি দপ্তরের ব্লক পর্যায়ের উপসহকারী কর্মকর্তারা নিয়মিত পানচাষিদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে পানচাষিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে আমরা শিগগিরই একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করব। সেখানে কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পান চাষ করলে এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করলে তা বিদেশে রপ্তানি উপযোগী হবে, সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া হবে। চাষিদের প্রণোদনা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এই পান রপ্তানির পথ সুগম করতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব।
কৃ/স/জয়