কৃষি সময়
প্রকাশ : Aug 28, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সুনামগঞ্জে হাঁস-মাছ-গরু চাষাবাদে কৃষকদের ভাগ্য বদলাচ্ছে

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতাঃ 
সুনামগঞ্জে দুর্যোগে ফসল চাষাবাদে বার বার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা এখন বিকল্প আয়ের পথ হিসাবে হাঁস,মাছ,গরু লালন পালন করছেন। এ কাজে ইতোমধ্যে তারা ভাল টাকা আয় করছেন। এর মাধ্যমে তারা অনেকেই সচ্ছলতা পাচ্ছেন। দেখাদেখি দ্রুত অন্যরাও এ কাজে জাড়াচ্ছেন। 

জেলার দিরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে এখন ছোট-বড় অসংখ্যা হাঁসের খামার গড়ে উঠছে। অনেক বাড়িতে দুই-একটি গরু দিয়ে শুরু হয়েছে পারিবারিক খামার। কেউ পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি গরু ও মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন। ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে বিকল্প জীবিকার নতুন সম্ভাবনা।

স্থানীয়রা বলছেন, এসব খাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ ও খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে ঝুঁকি কম এবং সারা বছর আয় করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে একমাত্র বোরো মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে এসব উদ্যোগ এখন আশার আলো হয়ে উঠছে।

সুনামগঞ্জের কৃষিনির্ভর দিরাই উপজেলা মূলত এক ফসলের জনপদ। এখানকার হাজারো কৃষক বোরো ধানের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের সংসার চালান। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ধানের বাজারমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক প্রান্তিক কৃষক এখন এই পশু পালন এবং মাছ চাষাবাদে জড়িয়েছেন। 

দিরাই উপজেলার গরুর খামারি সামসুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর আগে মাত্র দুটি গরু দিয়ে তিনি খামারের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে সেই খামার বড় হয়েছে। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় ২৫টি গরু। ধানের ওপর শুধু নির্ভর না করে এই ব্যবসায় আসার পর আয় করার একটি স্থায়ী পথ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মাছ চাষেও সফলতার স্বপ্ন দেখছেন অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে পুকুরে মাছ চাষ করে আসছেন মৎস্যচাষী সাঈদ আহমেদ। 

তিনি জানান, প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে তার পাঁচটি পুকুর রয়েছে। মাছ চাষের পাশাপাশি তিনি গরু ও মুরগির খামারও গড়ে তুলেছেন। এসব খামার ও পুকুর দেখাশোনার জন্য পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন।

সাঈদ আহমেদ বলেন,ব্যবসা ভালোই চলছে। শুধু একটি আয়ের ওপর নির্ভর না করে কয়েকটি খাত নিয়ে কাজ করছি। এতে একদিকে আয় বাড়ছে, অন্যদিকে অন্য মানুষেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে।

স্থানীয় খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, দিরাই উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক গরুর খামার রয়েছে। এর বাইরে প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেই নিজেদের প্রয়োজন ও বাড়তি আয়ের আশায় একটি বা দুটি করে গরু পালন করা হচ্ছে।

দিরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় হাঁসের খামারও বাড়ছে। হাঁস খামারি সোহেল মিয়া জানান, তার খামারে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি হাঁস রয়েছে। খামারটি দেখাশোনার জন্য তিনি দুজন শ্রমিক রেখেছেন। আমাদের হাওরাঞ্চলে ধান হাঁসের ভালো খাবারের একটি উৎস। হাঁসের বয়স হয়ে গেলে বিক্রি করে দেওয়া যায়, আবার নতুন হাঁস আনা যায়। ডিম থেকেও নিয়মিত আয় হয়। তাই সঠিকভাবে পালন করতে পারলে হাঁসের ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক কম।

স্থানীয়দের মতে, বিকল্প আয়ের এসব উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে শুধু কৃষকের আয়ই বাড়বে না, বেকারত্বও কমবে। গ্রামের তরুণরা কাজের সুযোগ পাবেন এবং দীর্ঘ কর্মহীনতার কারণে সামাজিক নানা সমস্যাও কমে আসতে পারে।

হাওরপাড়ের মানুষের জীবন বরাবরই প্রকৃতিনির্ভর। বর্ষায় পানির সঙ্গে যুদ্ধ, শুষ্ক মৌসুমে ফসলের সঙ্গে যুদ্ধÑএই নিয়েই তাদের জীবন। অকাল বন্যা হলে চোখের সামনে তলিয়ে যায় সারা বছরের স্বপ্ন। আবার কষ্ট করে ধান ঘরে তোলার পর বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ে আরও গভীরভাবে। বোরো ধান ঘরে তোলার পর বছরের দীর্ঘ সময় অনেক মানুষের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। এই কর্মহীন সময়ই হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক ধরনের নীরব দুর্দশা হয়ে দেখা দেয়।

হাওরাঞ্চলে শুধু কৃষি চাষাবাদের সাথে জড়িত অনেক কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সারা বছর তারা ধারদেনা করেই চলেন। এভাবে বছরের পর বছর দুর্যোগে ফসল হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন। এমন কৃষককের সংখ্যা অনেক। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন,সরকারিভাবে এ জনপদের কৃষকদের ফসল চাষাবাদের বাইরে মৎস্য,প্রাণি সহ নানা কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিকল্প আয়ের পথে আনতে হবে।

এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সন্দ্বীপন মজুমদার বলেন, “হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য মাছ চাষ, হাঁস পালন ও গবাদিপশুর খামার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। দিরাই উপজেলা মূলত বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বোরো ধান ঘরে তোলার পর এ অঞ্চলের অনেক মানুষের হাতে দীর্ঘ সময় তেমন কোনো কাজ থাকে না। পরিকল্পিতভাবে মৎস্য খামারসহ বিকল্প আয়ের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে মানুষ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবে এবং কর্মহীনতা থেকে তৈরি হওয়া সামাজিক ও অপরাধপ্রবণতাও কমতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাছ, দুধ, ডিম ও প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বাড়বে, যা মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উপজেলা মৎস্য বিভাগ চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং আরও মানুষকে আধুনিক ও পরিকল্পিত মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাঁস পালনে আতাউরের ভাগ্য বদল

1

গারো পাহাড়ে লটকন চাষে নতুন সম্ভাবনা

2

১৯ লাখ গাঁট তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সরকারের

3

গুরুদাসপুরে পাটের বাম্পার ফলন হলেও দরপতনে হতাশ চাষিরা

4

এফ.আর মল্লিকের ইন্তেকাল,সীড এসোসিয়েশনের শোক

5

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান ডিআরইউয়ের

6

বর্ষণে ১৫ রোহিঙ্গার মৃত্যু

7

ভিএইচটি প্লান্ট চালু: খুললো আরো নতুন দেশে আম রফতানির দ্বার

8

বিষখালী নদীতে ভেসে উঠল মৃত ডলফিন

9

মূল্যস্ফিতি কিছুটা বেড়েছে

10

হাতিয়ায় ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন

11

দেশে শিং মাছ চাষাবাদ লাভ জনক হয়ে উঠেছে

12

রেণুপোনায় ভাগ্য বদলাচ্ছে তাদের

13

অতীতের রাষ্ট্রপরিচালকেরা দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছেন

14

বৃক্ষরোপণকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে-পরিবেশ প্রতিমন্ত্র

15

চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

16

চাঁদপুরে আখ চাষাবাদের পরিধি বাড়ছে

17

বাকৃবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি রফিকুল সম্পাদক আসাদুজ্

18

আল-আরাফাহ ব্যাংক ফিরিলো পুরোনো মালিকদের হাতে

19

সাংবাদিকতায় আগ্রহীদের বরণ করে নিলো রাবি প্রেসক্লাব

20