
নেত্রকোনা সংবাদদাতাঃ
তুষ-হারিকেনের আলো পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে ভ্যাপক সফলতা পেয়েছেন ইয়াছিন উল্লাহ নামের এক খামারি। এখানকার হাঁসের বাচ্চা নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে খামার করে শত শত খামারি এখন সফল,সচ্ছলতা পেয়েছেন। ইয়াছিনের সাথে অন্য খামারিরাও হাঁসের খামার করে নিজেদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। ইয়াছিন নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার কুঠুরীকোণা গ্রামের বাসিন্দা।
জানা যায়, ১৯৯০ দশকে ভাইয়ের উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হন এই উদ্যোক্তা। তার সাফল্য দেখে বিভিন্ন এলাকা থেকেই তরুণরা ছুটে আসেন তার কাছে। তিনি নিজের স্বার্থের কথা ভুলে সবাইকে বিলিয়ে আসছেন তুষ হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের ডিম ফুটানোর জ্ঞান।
এই পদ্ধতিতে বাচ্চা উৎপাদনে বিদ্যুৎচালিত কোনো যন্ত্র লাগে না। প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো ধানের তুষ, হারিকেন, বাঁশের চাটাই, লেপ, কম্বল, পুরোনো শাড়ি, বাঁশ ও কাঠের মতো সহজলভ্য সরঞ্জাম।
ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের এই পদ্ধতিটি খুবই সহজ, তবে সূক্ষ্ম নজর রাখতে হয়।
এ জন্য প্রথমে বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করা ডিমগুলো বাছাই করে রোদে শুকানো হয়। এরপর ৪০ থেকে ৫০টা করে ডিম একেকটি লাল কাপড়ে বাঁধা হয়। ডিম ফোটানোর জন্য একটি কক্ষের ভেতর মাটির চুলার মতো বড় সিলিন্ডার বানানো হয়। সেই সিলিন্ডারে বিছানো থাকে তুষ। সিলিন্ডারগুলো একটার পাশে আরেকটা রাখা হয়। একেকটি সিলিন্ডারের ভেতর একবারে সাতশ থেকে এক হাজার ডিম রাখা হয়। সেখানে তাপ দেওয়া হয় হারিকেন ব্যবহার করে।
এভাবে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের হার শতকরা ৮০ থেকে ৯০টি। ইলেকট্রিক ইনকিউবিটরেও শতকরা ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ ডিমে বাচ্চা পাওয়া যায়।
এখানে ১৮ থেকে ২০ দিন সিলিন্ডারের ভেতরে থাকে ডিমগুলো। এই নির্ধারিত সময়ে হারিকেন অদল-বদল করতে হয়। এরপর সেখান থেকে বের করে ডিমগুলো বিছানার ওপর রাখা হয়। সেই বিছানার নিচে থাকে তুষ আর ওপরে থাকে কাঁথা-কম্বল। আরও ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে শুরু করে।
তার এই অভাবনীয় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ইয়াছিনকে ‘প্রশিক্ষক’-এর মর্যাদা দিয়েছে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক, প্রাণিসম্পদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংবাদকর্মীরা তার এই অভিনব পদ্ধতি দেখতে ছুটে এসেছেন।
বিদ্যুৎ খরচ না থাকায় এবং জ্বালানি খরচ সীমিত হওয়ায় ইয়াসিনের এই পদ্ধতির কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও লোকমুখে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরা তো বটেই, ভারত থেকেও প্রায় ৫০০ জন নারী-পুরুষ তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অন্যকে শেখালে ব্যবসার ক্ষতি হবেÑএমন সংকীর্ণ ভাবনা ইয়াসিনের নেই। তিনি বিনা স্বার্থে সবাইকে এই কৌশল শিখিয়ে চলেছেন।
উদ্যোক্তা ইয়াসিন বলেন, ‘আমি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নারী-পুরুষদের হাঁস-মুরগি পালনে উদ্বুদ্ধ করে লক্ষাধিক মানুষের বেকার সমস্যার সমাধান করেছি। এটা ভাবলেই আমার গর্ব হয়। প্রশিক্ষণ চলমান রেখে আমি এক দিন বয়স থেকে বিভিন্ন বয়সের হাঁস ও হাঁসের বাচ্চা সারা দেশেই সরবরাহ করি। প্রাণি সম্পদ বিভাগ,তারা আমাকে শ্রেষ্ঠ সফল ও বিশেষ উদ্যোক্তা হিসেবে ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট দিয়ে উৎসাহিত করেছেন। এতে করে আমি অত্যাধিক আনন্দ পাই, পাশাপাশি কাজের আগ্রহ হাজার গুণ বেড়ে যায়।
নেত্রকোনার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম জানান, হাঁস খামারিদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। দিন দিন খামারির সংখ্যা বাড়তে থাকায় এলাকায় একটি আদর্শ খামার গড়তে শেডিং ইউনিট নির্মাণসহ অন্যান্য আধুনিক কৌশল শেখানোরও আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
কৃ/স/জয়