
নওগাঁ সংবাদদাতাঃ
বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। স্বাভাবিক গভীরের চেয়ে কয়েকগুন নিচেও মিলছে না পানি। এতে এসব এলাকায় ফলস চাষাবাদে পানি সেচে অদিক খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাাবর পানিরও সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কৃষি,পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য চরম উদ্বেগ তৈরি করছে।
জানা যায়, রাজশাহী, নওগাঁ,ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকট’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ৮৮৪টি মৌজা ‘উচ্চ’ এবং ১ হাজার ২৪০টি ‘মাঝারী’পানিসংকটাপন্ন। সব মিলিয়ে এসব এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারি হিসাবে এ তথ্য উঠে এসেছে।
নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহারে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। অনেক স্থানে নলকূপের গভীরতা বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
অথচ এসব এলাকায় একসময় ৯০ ফুট গভীরেই পাওয়া যেত ভূগর্ভস্থ পানি। এখন কোথাও ১২০, কোথাও ৩০০, আবার কোনো কোনো এলাকায় ১ হাজার ৪০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এসব এলাকায় সেচ সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় এবং কমছে বোরো আবাদ। একই সঙ্গে তীব্র হচ্ছে নিরাপদ খাবার পানির সংকট। সব মিলিয়ে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির দ্রুত পতন কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্যেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা নেমে হয়েছে ৩১ দশমিক ০৪ মিটার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে পানির স্তর আরও নিচে নেমেছে।
এমন অবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে উন্নয়ন সংস্থাগুলোও কাজ করছে। কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ডাসকো ফাউন্ডেশনের ‘সওয়াব’ প্রকল্প নিয়ামতপুর ও গোমস্তাপুরের ১৩টি ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সরবরাহ, পুকুর পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণ নিয়ে কাজ করছে।
প্রকল্পের আওতায় ৩৪টি কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, চারটি স্কুল ওয়াশ ব্লক, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি সুবিধা, ২০টি পুকুর পুনঃখনন ও ১০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাংলাদেশ পানি আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল ঘোষণা করে ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। পানীয় জল ছাড়া অন্য কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু বিধিনিষেধ জারি করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
একসময় একটি গভীর নলকূপ দিয়ে ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হলেও এখন অনেক এলাকায় তা কমে ৯০ থেকে ১১০ বিঘায় দাঁড়িয়েছে। ফলে সেচের আওতা কমছে, বাড়ছে কৃষকের খরচ। অনেক কৃষক বোরো আবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন কিংবা কম পানি প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
পোরশার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের গভীর নলকূপ পরিচালনাকারী সাইফুল ইসলাম জানান, একসময় ৯০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। পরে ১১০ ও ১২০ ফুট পর্যন্ত গভীর করতে হয়েছে। এরপরও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তার আশঙ্কা, এভাবে পানির স্তর নামতে থাকলে ভবিষ্যতে উত্তোলনের মতো পানিই থাকবে না।
এমন পরিস্থিতে নওগাঁয় ধান চাষের জমির পরিমাণও কমেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জেলায় ধান চাষ হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে।
বর্তমানে তা কমে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
পানির সংকটের সঙ্গে কৃষির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এক দশক আগে নওগাঁয় আম চাষের জমি ছিল প্রায় ৬ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
গমের আবাদও কমেছে। একসময় প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে গম চাষ হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) জানিয়েছে, প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে সংস্থাটির দাবি, এখনো বোরো উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েনি।
বিএমডিএর নওগাঁ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিতে হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ধানের তুলনায় কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় আম, গমসহ বিভিন্ন বিকল্প ফসলের আবাদ বাড়ছে। কৃষকেরা পানির ব্যবহার কমাতে ফসলের ধরন পরিবর্তন করছেন।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণের জন্য জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলায় ২ হাজার ১০৭টি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩ হাজার লিটার। এ ছাড়া নওগাঁয় ইতোমধ্যে ১৬টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। আরও পাঁচটি খালের খননকাজ শিগগিরই শুরু হবে। এসব খালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা গেলে স্থানীয় জলাধার সচল হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণও বাড়বে।
কৃ/স/জয়